শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২৬

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলবিরোধী কঠোর অবস্থান অব্যাহত

আনোয়ার ইসরাইলকে ‘সভ্য রাষ্ট্রসমাজের’ অংশ না বলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলবিরোধী অবস্থানে অনড় আছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, ইসরাইলকে আর ‘সভ্য রাষ্ট্রসমাজের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না এবং ফিলিস্তিনে ইসরাইলি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা বন্ধ, বসতি সম্প্রসারণ ঠেকানো এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত আরব ও ইসলামি দেশগুলোর বিশেষ সম্মেলনে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন যে, ইসরাইল ‘সভ্য রাষ্ট্রসমাজের’ অংশ হিসেবে থাকার সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জাতিসংঘে দেশটির সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থা বিবেচনার আহ্বান জানান। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বক্তব্যকে সমর্থন করেছে। এই বক্তব্যের দুই বছর পরও (২০২৬ সালে) আনোয়ারের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি; বরং তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপকে আরও কার্যকর ও বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিয়েছেন। গত ২১ আগস্ট আনোয়ার পশ্চিম তীরের ই১ এলাকায় ইসরাইলের নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা করেন। তিনি বলেন, পূর্ব জেরুজালেমের কাছের এই এলাকায় বসতি নির্মাণ হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত বিভক্ত হয়ে যাবে এবং একটি সংলগ্ন ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর তিনি ইসরাইলি বসতির বিরুদ্ধে ১২টি পশ্চিমা দেশের ঘোষণাকে স্বাগত জানান এবং শুধু বিবৃতি না দিয়ে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। ব্রিটেন, কানাডা ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ ইসরাইলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়ায় আনোয়ার তা স্বাগত জানান। আনোয়ার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু নিন্দা ও বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ‘বাস্তব ও বাধ্যতামূলক’ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এখন কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর মালদ্বীপ সফরের সময়ও আনোয়ার ইব্রাহিম ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গাজায় ‘নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিত্যাগ ঘটেছে’ এবং ‘মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলা দেশগুলো গাজায় প্রতিদিনের হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ সহ্য করছে’। মালয়েশিয়া ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে। একই দিন তিনি স্পষ্ট করেন যে, মালয়েশিয়া ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে বা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে পারে—এমন কোনো চালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে মালয়েশিয়াকে ব্যবহার করতে দেবে না। সন্দেহজনক কোনো চালান পাওয়া গেলে তা পরীক্ষা ও তদন্ত করা হবে এবং মালয়েশিয়ার আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। আনোয়ারের সাম্প্রতিক নীতিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ইসরাইলি বসতির পণ্য বর্জন এবং ইসরাইলমুখী সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন বন্ধ করা। ২০২৪ ও ২০২৬ সালের বক্তব্যগুলোর ধারাবাহিকতায় আনোয়ারের বর্তমান বার্তা হলো: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুধু নিন্দা যথেষ্ট নয়, ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতায় সহায়তাকারী সরবরাহ ও পরিবহন বন্ধ করতেও দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তার অবস্থান অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে ভিত্তি করে।