বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

গাজায় নৃশংস বোমাবর্ষণ: জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি হামাসের

সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে প্রস্তুতির কথা জানালেও ইসরায়েল গাজা সিটি দখলে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

গাজা উপত্যকার ভিতরে ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক
ছবি: গাজা উপত্যকার ভিতরে ইসরায়েলি ট্যাঙ্ক

গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও অভিযানের মধ্যে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) একদিনেই অন্তত ৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৩ জন গাজা সিটিতেই প্রাণ হারান।

ইসরায়েলি বাহিনী গাজা সিটিসহ পুরো উপত্যকাজুড়ে তীব্র অভিযান চালাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নির্বিচারে বোমাবর্ষণের কারণে সম্পূর্ণ পরিবার একসাথে নিহত হচ্ছে। গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি সবরিন আল-মাবহুহ বলেন, “আমার ভাইকে ঘরের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে। ওর স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গেও তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কেউ আর বেঁচে নেই।”

শেখ রাদওয়ানের একটি স্কুলে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর তাঁবু ইসরায়েলি গ্রেনেড হামলায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা জাকেয়া সামি বলেন, “শেখ রাদওয়ান পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। যদি এই দখল অভিযান থামানো না হয়, আমরা সবাই মরে যাব। যারা দেখছে আর কিছু করছে না, আমরা তাদের কখনও ক্ষমা করব না।”

গাজার গণমাধ্যম কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে ইসরায়েল অন্তত ১০০টি বিস্ফোরক রোবট ব্যবহার করে পুরো আবাসিক ব্লক ও মহল্লা ধ্বংস করেছে। শুধু গাজা সিটিতেই ১৩ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১,১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ গাজা সিটি থেকে জানান, পরিস্থিতি “প্রলয়ঙ্করী”। তিনি বলেন, “পুরো মহল্লা একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। মানুষ হারাচ্ছে তাদের জীবনের সবকিছু। এটি যেন এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।”

 

হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময়ে রাজি। তবে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অবরোধের কারণে খাদ্য ও ওষুধের প্রবেশ কঠোরভাবে সীমিত হওয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ জন, এর মধ্যে এক শিশু, অনাহারে মারা গেছে। এ পর্যন্ত ক্ষুধাজনিত কারণে ৩৬৭ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৩১ শিশু।

 

জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তরের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ১৪ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গাজায় ৮২ হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ ১ লাখ ৩২ হাজার ফিলিস্তিনি শিশু তীব্র অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে।

 
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দপ্তর জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হবে কেবল তখনই যখন হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হবে এবং সব ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দেবে। অন্যদিকে কাতার দাবি করেছে, তাদের সাম্প্রতিক মধ্যস্থতার প্রস্তাবে হামাস সম্মত হলেও ইসরায়েল এখনো সাড়া দেয়নি।

এদিকে ইউরোপের কয়েকটি দেশ, যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া আসন্ন জাতিসংঘ অধিবেশনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্যে “গণহত্যা” বলে অভিহিত করেছেন।

স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি ঘোষণা করেছেন, ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরকারি অর্থায়ন আর দেওয়া হবে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতও সতর্ক করেছে, পশ্চিম তীর দখল করলে তা আব্রাহাম চুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয় ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর বলেন, “গাজায় গণহত্যার নীতির বিরুদ্ধে এটি আমাদের নৈতিক অবস্থান।”