হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার জটিলতা নিয়ে দেশের নানা জেলা থেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় শিশুদের ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আনা হচ্ছে। সোমবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাম ও শ্বাসকষ্টে ভোগা সন্তানদের কোলে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন মায়েরা।
যশোরের ঝিকরগাছা থেকে আসা প্রায় তিন মাস বয়সী এক শিশুকে নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে টানা ১৬ দিন রাখা হয়েছিল। উন্নতি না হওয়ায় ও হামের পর নিউমোনিয়ার জটিলতা বাড়ায় পরিবার তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। শিশু হাসপাতালে চিকিৎসার পর অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও কাশি ও শ্বাসকষ্ট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে আসা দুই বছরের এক মেয়ের মা জানান, ১৫ থেকে ২০ দিন জ্বর ও ফুসকুড়ির পর তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাঁরা ঢাকায় ছোটেন; তাঁর অভিযোগ, হাসপাতালে এসেও শুরুতে কাঙ্ক্ষিত অক্সিজেন পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, মূল সমস্যা তৈরি হচ্ছে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হওয়ায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাম সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়া এবং নিউমোনিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও ফেলে রাখায় অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, হামের সবচেয়ে বড় জটিলতা নিউমোনিয়া; এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপুষ্টি।
হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার মার্জিয়া আফরোজ বলেন, নবজাতক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুরা হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত টিকা পায়নি। হামের সঙ্গে ডায়রিয়া, বমি, খিঁচুনি বা নিউমোনিয়া দেখা দিলে সাধারণ অক্সিজেনে শ্বাসকষ্ট সামলানো যায় না; তখন আইসিইউ, এমনকি ভেন্টিলেশন লাগে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিশু এখানে চিকিৎসা নিয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ৯৭ থেকে ৯৮টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ৯৭ শিশু চিকিৎসাধীন, সোমবারই নতুন ভর্তি হয়েছে ২৫ জন। হাসপাতালটির মোট শয্যা ৭০০টি হলেও আইসিইউ শয্যা মাত্র ১৪টি; ফলে জটিল রোগীদের আইসিইউ নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হচ্ছে। মার্জিয়া আফরোজ বলেন, যে পরিমাণ জটিল রোগী আসছে, সেই অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল অনেক কম। পরিচালক বলেন, চিকিৎসকসংকট থাকলেও সেবা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে; প্রায় ৩০০ চিকিৎসক কর্মরত আছেন এবং আগামী মাসের মধ্যে আরও ৫০ জন চিকিৎসক নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুরা যেন জটিল অবস্থায় না পৌঁছায়, সে জন্য নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত টিকা নিশ্চিত করাই প্রধান উপায়। জ্বর, সর্দি-কাশি বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, বারবার বমি বা ডায়রিয়ার মতো বিপৎসংকেত দেখা মাত্র শিশুকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।